জ্যোতিষ জ্ঞান, পূর্ব-জন্ম জ্ঞান ও কৈবল্য মুক্তি বা মোক্ষলাভ প্রসঙ্গ

ভারতীয় জ্যোতিষ হইল, একটি আধ্যাত্মবিদ্যা সম্পর্কিত শাস্ত্র। মানব, সংসার-সমুদ্রে কেবলমাত্র নিজকৃত কর্মফলই ভোগ করিয়া থাকে।

জাতক-জীবনের যাবতীয় প্রাক্তন কর্মফল, জন্মলগ্ন ও দশমলগ্ন হইতেই বিচার্য্য। চন্দ্র হইল জাতকের ‘মন’, সূর্য্য হইল ‘আত্মা’, এবং, ‘কেতু’ হইল অবচেতন মনের নির্দেশক গ্রহ। কেতুর আর এক নাম ‘প্রজ্ঞা’। কেতু হইল আধ্যাত্মিক গ্রহ, ‘মোক্ষ’ কারক। পুণরায়, রাশিচক্রের ‘দ্বাদশতম’ ভাব হইতেছে ‘মোক্ষস্থান’।

আত্ম-তত্ত্বজ্ঞানই মোক্ষলাভের একমাত্র উপায়। যখন আত্মজ্ঞান লাভ হইয়া ‘সমাধি’-স্তরে সাধক উন্নিত হন, তখন তাঁর আর ভেদজ্ঞান থাকে না, এক ও অদ্বৈত ব্রহ্ম-সত্তায় সাধক একীভূত হইয়া যান।  

জন্মলগ্ন ব্যতীত, প্রতিটি ভাবস্ফুট নির্ণীত হইবে,- দশমলগ্ন বা কর্মলগ্ন হইতে। জীবন ও মৃত্যু মূলতঃ অভিন্ন, অর্থাৎ, জন্ম ও মৃত্যু অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে, মৃত্যু বলিয়া ব্রহ্মাণ্ডে কিছুই নাই। মৃত্যু মূলতঃ একটি বিবর্ত্তনমাত্র। মৃত্যুকে উপলব্ধি করিয়াই মুক্তি, মোক্ষ বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হইয়া থাকে। মৃত্যুকে প্রকৃত সাধক বা যোগিগণ অতি সহজ ও স্বাভাবিক রূপে গ্রহণ করিয়া থাকেন। প্রকৃত জ্ঞানী মৃত্যুতে কখনও বিচলিত হন না।

পূর্বেই বলিয়াছি, ‘চন্দ্র’- মনের কারক গ্রহ। ‘চন্দ্র’- খণ্ডকাল বা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, মনের চিন্তা-ধারাকে প্রতিফলিত করিয়া থাকে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে, আমাদের মানসিক জগতে নানান বিচিত্র ধরণের চিন্তার স্রোত উৎপন্ন হইতে থাকে। ঐ চিন্তা-স্রোতের তরঙ্গ অনুসারে আমরা, কখনও উৎফুল্ল বা আনন্দিত থাকি আবার, কখনোবা প্রচণ্ড বিমর্ষ বা দুঃখ অনুভব হয়। আবার, মনই আমাদের সেই ‘আয়না’- যেখানে আমরা নিজ স্বরূপকে প্রতিফলিত রূপে দেখিতে পাইতে পারি। 

যেহেতু, কর্মদ্বারাই, ‘দেবত্ব’- প্রাপ্ত হওয়া যায়, সে কারণে কর্মের প্রভাবই প্রবল বলা হইয়া থাকে। কর্ম ত্রিবিধ, যথা – সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। কর্মফলের আশা না রাখিয়া অর্থাৎ, দেবোদ্দেশ্যে যে ‘কর্ম’- তাহাই সাত্ত্বিক কর্ম, ইহাকে ‘দিব্যভাব’ বলা হইয়া থাকে। সঙ্কল্প সহিত কামনাপূর্ণ যে কর্ম এবং যাহাতে হিংসাদি নাই, তাহা রাজসিক কর্ম, ইহাকে ‘বীরভাব’ বলা হয়, এবং, হিংসাদি যুক্ত ও কামনাপূর্ণ কর্মই তামসিক, ইহাকে ‘পশুভাব’ বলা হইয়াছে।  ভাব অর্থে ‘তন্ময়তা’-কে বুঝায়। ভগবৎশক্তি বিন্দুমাত্র আয়ত্ত করিতে হইলে, তাঁহাতে ‘তন্ময়’- হইতে হইবে।  

রাশিচক্রের পঞ্চম গৃহ নির্দ্দেশ করে জাতকের মন্ত্র-দীক্ষা লাভের বিষয়, দশম গৃহ নির্দ্দেশ করে প্রত্যহ যথা নিয়মে জপ অভ্যাস করিতেছে কি না। একাদশ গৃহ নির্দ্দেশ করে প্রাপ্তি বা সিদ্ধি লাভ। আমাদের এই ‘ভাণ্ড’ বা মনুষ্য দেহটি হইল বিশ্ব-‘ব্রহ্মাণ্ড’-র ক্ষুদ্র প্রতিরূপ, অর্থাৎ, আমাদের দেহ এবং দেহের মধ্যে যে ক্রিয়া সকল চলিতেছে, ঠিক তদনুরূপ ক্রিয়াই বৃহৎ-আকারে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে চলিতেছে। বিপরীত ভাবেও বলা যায়, – বৃহৎ বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড-মধ্যে যে ক্রিয়া চলিতেছে ঠিক তেমনই ক্রিয়া আমাদের ক্ষুদ্র-ব্রহ্মাণ্ড রূপ দেহভাণ্ডে চলিতেছে। আমরা ‘এক’ থেকেই বহু হয়েছি তাই, আমরা একে অপরের থেকে যতো দূরেই থাকি-না-কেন আমাদের মধ্যে একটি আশ্চর্য ধরণের সম্পর্ক থেকেই যায় (non-local connection)।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: